মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ : শৈশবে মায়ের কাছে স্পেনের দক্ষিণে আন্দালুসিয়া অঞ্চলে অবস্থিত বিখ্যাত কর্ডবা নগরীর মুসলিম সভ্যতা ও গ্রানাডার নাস্রিদ সালতানাতের নয়নাভিরাম স্থাপত্য নিদর্শন আলহামরা প্রাসাদ সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি ।

১৯৭৫ সালে আমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ কে এম শফিউল্লাহ খান (তৎকালীন মেজর শফিউল্লাহ) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে ভুমধ্যসাগরীয় উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতে ডাক্তার হিসাবে চার বছরের মেয়াদে প্রেষণে বদলী হন। সেই সুবাদে আমার লিবিয়ায় আসার সুযোগ হয়।

New Tripoli School এ চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় ইউরোপীয় ইতিহাসের অংশ হিসাবে স্পেনের ইতিহাস সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা লাভ করি। ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল দুর্নিবার। প্রখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর জনপ্রিয় চিত্রকর্ম গুয়ের্নিকা অবলোকন করে চিত্রাঙ্কনের উপর অনেক অনুপ্রেরণা পেয়েছি । মাধ্যমিক পরীক্ষার ইংরেজি প্রথম পত্রের পাঠ্য তালিকায় জনপ্রিয় স্প্যানিশ সাহিত্যিক Miguel de Cervantes এর জনপ্রিয় প্রবন্ধ “Don Quixote” অন্তর্ভুক্ত ছিল। এভাবে বিভিন্ন সময়ে স্পেনের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য সম্পর্কে সম্যক ধারনা পেয়েছি। স্বপ্নেও কখনও ভাবিনি যে সেই দেশেই একদিন আমার চাকুরীসূত্রে বদলী হবে। 

গত ২৫ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখ শুভ বড়দিনে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের সুপরিসর বিমানযোগে ঢাকা থেকে মাদ্রিদস্ত বাংলাদেশ মিশনের বাণিজ্যিক অনুবিভাগে কমার্শিয়াল কাউন্সেলর হিসাবে যোগদানের উদ্দেশ্যে স্পেনে আসি। চাকুরীসুত্রে এটিই আমার প্রথম ফরেন পোস্টিং হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মনের ভিতর একটা মিশ্র ও রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করছিল। ইতোমধ্যে দু বছরের বেশী সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে স্পেনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অবলোকন, রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাব ও ষাঁড়ের লড়াই দর্শন, ফ্ল্যামেনকো এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার উপভোগের অভিজ্ঞতা সংক্ষেপে আলোকপাত করছি।

স্পেন (সরকারীভাবে Kingdom of Spain নামে পরিচিত) একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। ইউরোপের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে আইবেরীয় উপদ্বীপের (Iberian Peninsula) অধিকাংশ অংশ (শতকরা ৮৫%) জুড়ে স্পেনের অবস্থান । স্পেন পশ্চিমে পর্তুগাল এবং উত্তর পূর্বে ফ্রান্স ও অ্যান্ডোরার সাথে পাইরেনিস পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত। স্পেনের উত্তর পশ্চিমে অ্যাটলান্টিক মহাসাগর রয়েছে। এ ছাড়াও ভুমধ্যসাগরস্থ ম্যালরকা, মেনরকা ও ইবিজা ব্যালেরিক দ্বীপসমূহ, অ্যাটলান্টিক মহাসাগরে মরক্কোর উপকূলে ক্যানারি দ্বীপসমুহ এবং উত্তর আফ্রিকার দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর কেউটা ও মেলিলা স্পেনের অন্তর্ভুক্ত। জিব্রালটার প্রণালী স্পেনকে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে পৃথক করেছে। স্পেনের মোট আয়তন ৫০৪,০৩০ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৪৬.৬৫ মিলিয়ন।

আয়তনের দিক থেকে পশ্চিম ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ফ্রান্সের পর এবং সমগ্র ইউরোপের মধ্যে রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইউক্রেনের পরে স্পেনের অবস্থান । উত্তরপূর্বে  এব্রো, মধ্যে তাখো এবং পশ্চিমে গুয়ায়াদালকিভির এই তিনটি নদী স্পেন জুড়ে প্রবাহিত। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের (UNESCO World Heritage Site) সংখ্যার দিক থেকে স্পেনের অবস্থান তৃতীয়। ইউরোপের মধ্যে উষ্ণতম এবং সবচেয়ে রৌদ্রজ্জ্বল দেশ স্পেন। এ দেশে বছরে ৩০০০ ঘণ্টার উপরে রোদ থাকে। এ জন্যই স্পেন এর পর্যটনের স্লোগান “Everything under the sun” এতো জনপ্রিয় । 

স্পেন একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র (Constitutional monarchy)। এই ব্যবস্থায় স্পেনের রাজা হলেন রাষ্ট্রপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি হলেন একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারি নেতা। সরকারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত। কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের দুইটি কক্ষের হাতে ন্যস্ত। বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইন প্রণয়নকারী বিভাগ থেকে স্বাধীন। স্পেনের সরকারী ভাষা কাস্তিলিয়ান স্প্যানিশ। অন্যান্য ভাষার মধ্যে ব্যাস্ক, কাতালান এবং গালিসিয় উল্লেখযোগ্য । 

স্পেনে শতকরা প্রায় ৮০% লোক ক্যাথোলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। রাজধানী মাদ্রিদ আয়তনের দিক থেকে স্পেনের সর্ববৃহৎ নগর।লোকসংখ্যা ৩৩ লক্ষ । অন্যান্য জনবহুল বৃহৎ নগরের মধ্যে বার্সিলোনা, ভ্যালেন্সিয়া, সেভিয়া, সারাগোসাবিলবাও, মালাগা, মুরসিয়া অন্যতম । ১৭টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নিয়ে স্পেন গঠিত । এ অঞ্চলগুলোকে স্পেনীয় ভাষায় ‘Comunidades Autónomas’বলে। এ ছাড়াও দেশটি আরও পঞ্চাশটি প্রদেশে (provincias) বিভক্ত ।

ফিয়েস্তা (Fiesta) ও সিয়েস্তার (Siesta) দেশ স্পেন। স্প্যানিশ ভাষায় ফিয়েস্তা মানে উৎসব আর সিয়েস্তা মানে দুপুরের সংক্ষিপ্ত ঘুম (short nap) বা বিশ্রাম । স্পেন এর জনগণ এ দুটিরই সর্বোত্তম ব্যবহার করতে জানে । সারাবছর জুড়ে স্পেনে বিভিন্ন উৎসব লেগেই থাকে। তন্মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়ের লড়াই (Bull fight), ফুটবল খেলা, ফ্ল্যামেনকো শো, টমেটো (La Tomatina) উৎসব প্রণিধানযোগ্য। এ ছাড়াও সাহিত্য, স্থাপত্য, চিত্রাঙ্কন এবং সুখাদ্য ভোজন বিদ্যার (Gastronomy) জন্য স্পেন প্রসিদ্ধ ।

ষাঁড়ের লড়াই

১৭২৬ সাল থেকে ষাঁড়ের লড়াই স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে । এটি স্পেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রথা হলেও একইসাথে অনেক বিতর্কিত । প্রতি বছর এই উৎসবে ষাঁড়ের শিং এর আঘাতে বুলফাইটারসহ সাধারণ মানুষেরও প্রাণহানি ঘটায় এটি রক্তক্ষয়ী খেলা (blood sport) হিসাবেও পরিচিত। মাদ্রিদের Las Ventas এ অবস্থিত Plaza de Toros বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ Bull-ring । ষাঁড়ের লড়াই মার্চের শেষে শুরু হয় এবং অক্টোবারের শেষ পর্যন্ত চলে। সাধারণত প্রতি রোববারে ষাঁড়ের লড়াই অনুষ্ঠিত হয় । মূল ষাঁড়ের যোদ্ধা অর্থাৎ বুলফাইটারকে Matador বলে। ষাঁড়ের লড়াই অবলোকনের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী দর্শক প্লাজা দে তোরস স্টেডিয়ামে সমবেত হয়। স্টেডিয়ামের দর্শক ধারন ক্ষমতা ২৫,০০০ জন। নিষ্ঠুরতার কথা বিবেচনা করে কাতালোনিয়া এবং ক্যানারি আইল্যান্ডে ষাঁড়ের লড়াই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিটি ষাঁড়ের লড়াই পরিচালনার জন্য ছয়টি (ন্যূনপক্ষে চার বছর বয়সের) ষাঁড়ের প্রয়োজন হয় যেগুলো তিনজন ম্যাটাডরের মাধ্যমে মারা হয়। ষাঁড়ের লড়াই সাধারণত দেড় ঘণ্টা স্থায়ী হয়।

ফ্ল্যামেনকো

ফ্ল্যামেনকো স্পেনের একটি ঐতিহ্যবাহী বিশেষায়িত শিল্পকর্ম যা সঙ্গীত, নৃত্য ও গিটার এই তিনটি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। স্প্যানিশ জিপসি বা যাযাবর সম্প্রদায় থেকে ফ্ল্যামেনকো  (Flamenco) শিল্পকর্মের উৎপত্তি । এটি মূলত লোকসঙ্গীত (Folk song) যার আরবি গানের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। স্পেনে ঐতিহাসিক আন্দালুসিয়া অঞ্চলে প্রথম ফ্ল্যামেনকোর প্রবর্তন হয়। ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারনে এটি পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সমগ্র স্পেনে বিস্তার লাভ করে । করতালি, ট্যাপ নাচ এবং উচ্চকণ্ঠে “ওলে” বলে সমস্বরে শিল্পীদের উৎসাহ প্রদান করাও ফ্লামেনকোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিল্পীরা উজ্জ্বল ও বর্ণিল পোশাক পড়ে ফ্ল্যামেনকো সঙ্গীত পরিবেশন করে থাকে। 

সুখাদ্য ভোজন বিদ্যা

সুখাদ্য ভোজন বিদ্যার (Gastronomy) জন্য স্পেন প্রসিদ্ধ। স্পেনের ঐতিহ্যবাহী রান্নার মূল উৎস বা ভিত্তি ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্য (Mediterranean diet) যা বিশ্বে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ভু-কৌশলগত (Geo-strategic) গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারনে স্পেনে অঞ্চলভেদে খাবারের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। ভূমধ্যসাগরীয় রন্ধন প্রনালীর ন্যায় রসূন ও জলপাই তেল মূলত এই দুটি উপাদানের সংমিশ্রণে স্প্যানিশ রান্না হয়। যেহেতু স্পেন আইবেরীয় উপদ্বীপে অবস্থিত, তাই সামুদ্রিক খাবার স্বাভাবিকভাবে স্প্যানিশ সুখাদ্য ভোজন বিদ্যায় (Gastronomy) তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে । স্পেন এর সুখাদ্য ভোজন বিদ্যা মূলত রোমান, ভিসিগথ এবং আরব এই তিন সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত ।

টাপাস

টাপাস (Tapas) হালকা জলখাবার হিসাবে সাধারণত বিভিন্ন বার বা রেস্টুরেন্টে বিয়ার বা মদের সাথে পরিবেশন করা হয় । এর উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক মতভেদ রয়েছে । কথিত আছে যে রাজা পঞ্চম আলফনসো মূল খাবারের পরে মদ্যপানের সাথে জলখাবার খেয়ে আরোগ্য লাভ করেন। এরপর থেকে এই খাদ্যের প্রচলন হয় । পরবর্তীতে তিনি সরাইখানার মালিকদের জলখাবারের সাথে মদ পরিবেশনের আদেশ প্রদান করেন । জনশ্রুতি আছে যে রাজা তেরো আলফনসো সরাইখানায় পানপাত্র চান । এলাকাটি খুব ঝড় প্রবণ হওয়ায় পাত্র প্রদানের আগে পরিবেশনকারী ধুলা বালি থেকে রক্ষার জন্য সেটি শূকরের মাংসের ফালি দিয়ে ঢেকে রাখে । সেই থেকে রাজা জলখাবারের সাথে মদ্য পান করেন এবং আরেকবার মদ্য পরিবেশনের সময় তা ঢেকে রাখেন । এভাবেই স্পেনে টাপাস খাদ্যের প্রবর্তন হয় । 

সাধারণত হ্যাম, মসলাদার টমেটো সসের মধ্যে আলুর কিউব (Patatas bravas), ঝিনুকের মণ্ডবিশেষ (Tigres), ভাজা স্কুইড মাছ (Calamares), গাম্বাস ফিল ফিল (Prawns in hot garlic oil), কড ফ্রিটারস, ভাজা কাটল্ মাছ (Grilled Cuttle fish) টাপাসের অন্তর্ভুক্ত । সামুদ্রিক খাবার ছাড়াও পাইয়া (Paella), তরতিয়া (Spanish omelette) টাপাসের অন্তর্ভুক্ত । স্পেনে টাপাস পরিবেশনের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান মাদ্রিদ, সেভিয়্যা ও সানসেবাস্তিয়ান ।

রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাব

ফুটবল স্পেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা । স্পেনের প্রতিটি শহরে ফুটবল খেলার দল ও মাঠ রয়েছে। স্প্যানিশ জাতীয় ফুটবল দল ২০১০ সালে ফিফা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয় । স্প্যানিশ ফুটবল লীগ ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক । রিয়াল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাব একটি  স্প্যানিশ পেশাদার ফুটবল ক্লাব যার অবস্থান মাদ্রিদে। এটি বিংশ শতাব্দীর সফলতম ক্লাব এবং ইউরোপের সবচেয়ে বেশি শিরোপাজয়ী দল। ক্লাবটি ফিফার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য । রিয়াল মাদ্রিদের নিজস্ব মাঠের নাম সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। এটি ১৯৪৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর উন্মোচন করা হয় । রিয়াল মাদ্রিদ ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ১০ বার এবং লা লিগা ৩২ বার জিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে । অন্যান্য ফুটবল দলের মত রিয়াল মাদ্রিদের মালিকানা কখনো পরিবর্তন হয়নি। এটি ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠালগ্নের সদস্যদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে । বিশ্বের অনেক স্বনামধন্য তারকা যেমন রোনালদো, বেকহাম, জিদান, লুইস ফিগু, রর্বাতো কার্লোস এই ক্লাবের সদস্য। 

 

মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ: কমার্শিয়াল কাউন্সেলর, বাংলাদেশ দূতাবাস, মাদ্রিদ, স্পেন।