-খছরু চৌধুরী

বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ মোকাবেলায় সমগ্র বিশ্বই আজ ব্যতিব্যস্ত। দুর্যোগময় পরিস্থিতি সামলে নিতে উন্নত-অনুন্নত সকল দেশের সরকার ও ইহার অধীনস্ত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামোগুলো নাস্তানাবুদ হচ্ছে। করোনাভাইরাসের আক্রমনে মানুষের মৃত্যর মিছিল দিনের পর দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে দেখে ইতালী-ষ্পেন-বৃটেন-জার্মানীর মত ধনবাদী অর্থনৈতক কাঠামোর উন্নতদেশগুলোর রাস্ট্র-নায়ক ও রাজনীতিবিদগণকেও অসহায় দেখাচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর দেশ কিউবা যুগ-যুগ ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মধ্যে থেকেও কভিড-১৯ সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলায় পৃথিবীর অনেক দেশে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্য সরঞ্জাম প্রেরণ করায় রাষ্ট্র-দর্শন হিসেবে সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী আদর্শের একটা গুণগত পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে। হু চি মিন এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সমসাময়িক স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ ভিয়েতনামেও কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মারা যাওয়ার কোন খবর মিডিয়াতে আসেনি। কভিড-১৯ এর এই অপ্রত্যাশিত আক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বুর্জোয়া-ধনবাদী সমাজ কাঠামোর দুর্বলতাগুলো সমাজ বিজ্ঞানীদের চোখের সামনে নিয়ে আসছে। কোন দেশ কিভাবে করোনা বিপর্যয় সামলে উঠবে, পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থা কেমন হবে, পৃথিবী আগের মত বৈশ্বিক অর্থনৈতক বন্ধনের আবর্তনে থাকবে কি থাকবে না এমন প্রশ্নও মুখ্য হয়েছে।

 

দেশের সীমিত সম্পদ আর অদক্ষ আমলাতন্ত্র ও সহকর্মীদের সাথে নিয়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র গৃহিত পদক্ষেপগুলো সর্বমহলে প্রহণযোগ্যতা ও প্রসংশার খ্যাতিতে বিশ্ব বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনেও উঠে এসেছে শেখ হাসিনার নাম। করোনা ধাক্কার শুরুতেই পরিস্থিতি সামলে নিতে রাষ্ট্রের সকল অংশের মানুষের জন্য ঘোষিত বিশাল অর্থের প্রণোদনা প্যাকেজ জন-মনে স্বস্তি এনেছে। একজন সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দৃঢ়তা, বিচক্ষণতা, দুরদর্শিতার প্রশংসা তার প্রতিদ্বন্দীদের মুখেও এবার শুনা গেছে। সর্বশেষ তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, করোনাকে মোকাবিলা করতে জরুরীভাবে আরও ২ হাজার চিকিৎসক ও ৬ হাজার নার্স নিয়োগ করার। মানব সৃষ্ট বা প্রকৃতি সৃষ্ট যে কোন দুর্যোগে দেশের সরকার প্রধানের নির্ঘুম চিন্তাভাবনা, শ্রম, দায়িত্ববোধ দেশপ্রেমের অংশ হলেও আমার ভাবনায় প্রশ্ন আসে যার যার চেয়ারের অবস্থান থেকে সকলের-ই তো সমান দায়িত্ববোধ থাকা চাই; সেটা খুব বিরল। দেশপ্রেম, মানুষের প্রতিভালোবাসা ও দায়বোধের ধারণা সকলের সমান হয়ন, ম্যান টু ম্যান ভেরী করে - এটা মেনে নিয়েও যে প্রশ্নটি করা যায়, তাহলো - রাষ্ট্র ও সরকারের নানা ধরণের পদ-পদবী নিয়ে যারা প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে রয়েছেন, তারা কি প্রয়োজনীয় ও জরুরী বা অতি-জরুরী বিষয়াদিতেও প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য সর্বরাহ করছেন? নীচের আলোচনায় বিষয়টি পরিস্কার ধরা পড়বে এবং অদক্ষ আমলাতন্ত্রই যে মানবিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় এরও একটা তথ্য-উপাত্তের খন্ড চিত্র পাওয়া যাবে।

 

জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনায় একটি মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র একটি চমৎকার গাইড লাইন্স রয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুসরন করেই সরকার জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি- ২০১১ অনুমোদন করেছেন। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তথা ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি উভয় নির্দেশনাতেই স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য একটা আদর্শ জনবল কাঠামোর ধারণা দেয়া হয়েছে। যার অনুপাতিক হার ১ঃ৩ঃ৫। অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে নিমিত্তে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স ও ৫ জন অন্যান্য জাতের স্বাস্থ্যকর্মীর পদ-সৃজন ও নিয়োগদানের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। এইরকম জনবল কাঠামোর পরামর্শটা হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজের ধারা বা পদ্ধতির অনুকরণীয় নিয়মে। স্বাস্থ্যসচেতন নাগরিক মাত্রেই জানেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসা বিজ্ঞানে নির্দেশিত কাজের ধারা বা পদ্ধতি প্রধানত: দু’টি - একটি ‘প্রিভেন্টিভ’ বা রোগ-প্রতিরোধের কাজের ধারা - যেখানে একদল স্বাস্থ্যকর্মী স্থাপনা বা হাসপাতালের বাইরে মাঠ-পর্যায়ে জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবস্থান করে রোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নিরন্তর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন। যেমন - আমাদের দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে কর্মরত স্যানিটারী ইন্সপেক্টর, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য সহকারীরা হলেন রোগ-প্রতিরোধের স্বাস্থ্য-কর্মী, যে পদগুলোর জন্ম হয়েছিল বৃটিশ আমলে। অন্যটি হচ্ছে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ‘কিউরেটিভ’ বা রোগীর উপশমের চিকিৎসামূলক ধারা। যে ধারায় কাজের পদ্ধতিতে একদল স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক ও নার্স) স্থাপনার ভেতরে (হাসপাতালে) আক্রান্ত রোগীর আরোগ্যলাভের নিমিত্তে নিরন্তর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করেন। রোগ নির্ণয় ও রোগের বিশ্লেষণ কাজের ধারাটিও আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের জনবল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব বহন করছে।

 

বর্তমান সময়ে দেশে ছোট-বড় সরকারী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৮৮৬৮, বেসরকারী ১২৪৪৯। এই পরিসংখ্যান থেকে প্রশিক্ষণবিহীন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী দ্বারা পরিচালিত ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাদ রাখলে অনুধাবন করা সহজ হবে যে এই কয়েক বছরে এদেশে মানুষের মৌলিক অধিকার কতটা বাণিজ্যিক হয়েছে। সে যাই হোক, সেবাপ্রতিষ্ঠান যেখানে বেড়েছে, সেখানে সবধরণের স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়াটাই স্বাভাবিক এবং কাম্য। দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ কয়েক যুগধরে, বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের শোকাবহ ট্র্যাজেডিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বঙ্গবন্ধু সরকারের পতনের মধ্যদিয়ে পাকিস্তানের এদেশীয় প্রেতাত্মারা রাষ্ট্রের রোগ-প্রতিরোধের জনবল বিস্তৃতি, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের নিরিখে নতুন পদ-সৃজন নিয়োগ ইত্যাদি বিষয়াদিতে যে অনীহা সৃষ্টি করেছিলেন তা’ আজও অব্যাহত আছে। বস্ত নিরপেক্ষ বিচার বিশ্লেষণে রোগ-প্রতিরোধের ধারার জনবল বৃদ্ধিতে অনীহার দু’টি কারণ হলো গণবিমূখ নীতি এবং একটি বিশেষ শ্রেণির স্বার্থে চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের বাজার সম্প্রসারণ। এটা এমনই এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, এখানে রাষ্ট্র ও সরকারের অনুমোদিত স্বাস্থ্যনীতিও চরমভাবে লঙ্গিত। পুরানো তথ্যাদি থেকে জানা যায় ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার প্রশাসনিক রিফর্মেশনের অধীনে রোগ-প্রতিরোধের ধারায় কাজের জন্য ৫৫৬ টি স্যানিটারী ইন্সপেক্টরের পদ-সহ অন্যান্য ধরণের ২৭ হাজার ৫ শত প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্য-কর্মীর পদ অনুমোদন করেছিলেন। একই সময়ে কিউরেটিভ ধারায় কাজের স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক ও নার্স) মোটের উপর ১২ বা ১৪ হাজারের বেশী ছিলনা। যদিও এখন দেশে স্বাস্থ্যবিভাগের অধীনে কর্মরত কিউরেটিভ ধারার স্বাস্থ্যকর্মীর (চিকিৎসক ও নার্স) সংখ্যা ১ লাখের অধিক হয়েছে।

 

বৈশ্বিত মহামারী কভিড-১৯ এর চিকিৎসায় ডাক্তার ও নার্স নিয়োগের উদ্যোগ সরকারের একটি ইতিবাচক প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই সময়ে রোগ-প্রতিরোধের জনবল বাড়ানো যে আরও বেশী জনগুরুপূর্ণ পদক্ষেপ এই সঠিক তথ্যটি যারা সরকার প্রধান ও নীতিনির্ধারকদের অবহিত করবেন সেই সকল আমলারা হয় অদক্ষ নয়তো রাষ্ট্রের ভালো-মন্দের খোঁজ খবর রাখার চেয়ে নিজের ভালো-মন্দের খবর নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করেন। কে না জানে, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মৌল বাণীটি হচ্ছে - “রোগের চিকিৎসার চেয়ে, রোগের প্রতিরোধই হলো উত্তম ব্যবস্থা!” এই ব্যবস্থাপনা নীতিটি ব্যয় সাশ্রয়ী বলে নরওয়ে, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র-সহ দুনিয়ার অধিকাংশ দেশের সকারগুলোর কাছে রোগ-প্রতিরোধের কর্মপদ্ধতি অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। কিন্তু আমাদের দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা বিজ্ঞান নির্ধারীত কর্মপদ্ধতিটি চাপিয়ে রেখে ১৯৭৩ এর পর থেকে শুধুমাত্র কিউরেটিভ ধারায় জনবল বাড়ানোর ফলে গোঠা স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনাই ম্যাজিকের মত আকৃতি ধারণ করেছে। ম্যাজিক দিয়ে সাময়িক মনোরঞ্জন হলেও স্থায়ী জনকল্যাণ যে সম্ভব নয় তার বড় উদাহরণ তো ছিল ৮ মার্চের করোনা রোগী সনাক্ত করণের পরবর্তী ২ সপ্তাহ। দেশে সরকারী ও সরকারের অনুমোদনে গড়ে উঠা হাজার হাজার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সমূহের স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি-শূন্যতা কি এর জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ নয়?

 

দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় স্যানিটারী ইন্সপেক্টরেরা হলেন রোগ-প্রতিরোধের বুনিয়াদি জনবল। সরকারী ব্যয়-বিনিয়োগে তিন বছরের প্রশিক্ষণ দিয়ে এদেরকে তৈরী করা হয় মহামারী রোগ-প্রতিরোধ, জনগোষ্ঠীর খাদ্য-স্বাস্থ্য ও সার্বিক স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন বিষয়াদির উপর ২৮০০ মার্কস এর কোর্স ক্যারিকুলাম অনুসরন করে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে ২০০৯ সাল এই দক্ষ-স্বাস্থ্য জনবলের পরিমাণ ২২’শ র কম-বেশী। মাঠ-পর্যায়ে রোগ-প্রতিরোধ, দুর্যোগ মোকাবিলা স্যানিটারী ইন্সপেক্টরদের কাজের মূলভিত্তি।

 

চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের স্বার্থ-রক্ষার নীতিতে প্রশাসন পরিচালনা করায় ১৯৭৩ সালের বঙ্গবন্ধু সরকারের পর থেকে আজ অবধি স্যানিটারী ইন্সপেক্টরদের একটি নতুন পদ সৃজিত না হলেও এবারের মহাদুর্যোগের অভিজ্ঞতা নিয়ে রোগ-প্রতিরোধের স্বাস্থ্য-জনবলের সংখ্যা বাড়ানোর জরুরী ও অতি-জরুরী প্রয়োজনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। অদক্ষ আমলাতন্ত্র সেই প্রয়োজনের তাগিদ কতটা অনুভব করেন এটা আমার জানা নেই। কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য-জনবল ছাড়া রোগ-প্রতিরোধ ও সুস্থ জাতি গঠন কতটা অসম্ভব - এই প্রশ্নে সুরাহা করতে হলে জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য-জনবল নিয়োগের বিকল্প নেই। (২৮.৪.২০২০)

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট, স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ।

e-mail: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.