- খছরু চৌধুরী

সাহেদ! সাম্প্রতিক বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এক আলোচিত নাম। গণমাধ্যমের তথ্য মতে, সাহেদের উত্থানের শুরু প্রতারণা দিয়ে। যে গণমাধ্যম গুলো আজকে এসে সাহেদের অতীত বর্তমানের পূঙ্খানুপুঙ্খ জীবন চরিত বিশ্লেষণ করছেন, সেই গণমাধ্যমের কোন কোনটি চ্যানেল তো সাহেদকে নিয়ে কিছু দিন আগেও কতটা মাতোয়ারা ছিল তা এখনো আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। গায়ে মুজিব কোর্ট জড়িয়ে আওয়ামী ব্যান্ডেড রকমারি পদপদবীর ভার তার এতটাই ওজনদার ছিল যে, মিডিয়াওয়ালারা বুঝতেই পারেনি এই সাহেদ আসলে চরিত্রগতভাবে খুনী খন্দকার মোশতাকের অনুসারী! আমার প্রশ্ন কিন্তু অন্য জায়গায়। অর্থাৎ চিকিৎসা সেবার মত এমন একটি মানবিক সেবার বাণিজ্যে এরকম অমানুষেরা জন্ম নেয় কেন? এই অমানবিক বাণিজ্যে সাহেদ কি একজন, না আরও সাহেদরা আছে?

আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে, মোহাম্মদ নাছিম (প্রয়াত, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী) স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ঢাকার একটি নামী-দামী হাসপাতাল টাকা পরিশোধ করতে না পারায় মৃতের লাশ আটকে রেখেছিল! মাননীয় মন্ত্রীকে মধ্যস্থতা করে লাশ ছাড়াতে হয়েছিল। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক রাষ্ট্র- ব্যবস্থাপনার নিয়মে মানুষের চিকিৎসা ও শিক্ষার মত মানবিক মৌলিক অধিকারগুলো বাণিজ্যিক করা হলেও এর একটা স্বচ্ছ নিয়ম-নীতি থাকে। এটা পুঁজিবাদের বিশ্ব মোড়ল বলে খ্যাত দেশ আমেরিকাতেও আছে, আমাদের দেশেও আছে। এই প্রিন্সিপল গুলোর মূল কথা হলো, মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো বাণিজ্যিক হলেও এর নিয়ন্ত্রণ থাকবে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে। প্রকৃত অর্থে বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা বলতে সরকার নিয়ন্ত্রিত, সরকারের আইন, বিধি-বিধান মেনে পরিচালিত স্বাস্থ্য সেবা বুঝায়। জনস্বাস্থ্যের এক সেমিনারে একজন বক্তা তথ্য দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যতগুলো আইন কানুন আছে, পৃথিবীর অনেক দেশেই তা'নেই। আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই, অনুসরণ নেই এবং এর সাথে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অদক্ষ ও দালাল সাংবাদিকতার সুযোগ নিয়েই এই সাহেদরা তৈরী হয়, তৈরী হচ্ছে। সাহেদ একজন নয়, সাহেদ বহুজন রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি পেশাজীবি সংগঠনে যুক্ত থাকার সুবাদে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়াদি নিয়ে ভাবেন এমন কিছু গুণীজনের সাথেও আমার পরিচয় ও যোগাযোগের সৌভাগ্য রয়েছে। এদের কেউ কেউ সরকারের বড় আমলা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সবচেয়ে বড় দৈন্যতায় রয়েছেন যাঁরা তাঁদের একদল হলেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংবাদকর্মী আর অন্যদল হলেন রাজনীতিবিদ। আধুনিক রাষ্ট্রে চতুর্থ স্তম্ভের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে সংবাদপত্র। রাজনীতিবিদেরা সরকারের মাধ্যমে পরিচালন করেন রাষ্ট্র যন্ত্র। জনগণের পক্ষে সংবিধান, আইন বিধি থাকার পরও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়াদিতে সমাজের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির অজ্ঞতা, অনাগ্রহ ইত্যাদি দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামন্য প্রতারক সাহেদরা একসময়ে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে প্রতারণা করার সাহস পায়, মানুষের জীবনের হন্তারক হয়ে টাকা কামায়। এখানের জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডান বা বামের রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি ও অাদর্শগত পার্থক্যওন খুব একটা নেই বললে চলে।

এই সাহেদকে বুদ্ধিজীবি ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বানিয়ে যে যে ইলেকট্রনিক মিডিয়া জনগণকে জ্ঞান দিতেন এরা সাহেদ বা আরও অনেক সাহেদদের জোচ্চুরির কমিশন ভোগী কি না তা' ও খতিয়ে দেখা উচিত। দূর্বৃত্তের দুষ্টচক্র এখন রাজনীতি, সাংবাদিকতা, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের সবখানে বিস্তৃত। যদি তাই না হয় তাহলে, এসব মিডিয়ায় সাহেদ এবং সাহেদদের মতো অমানুষ চিকিৎসা বণিকেরা জনগণকে জ্ঞান বিতরণের সাহস পায় কি করে? আমি তো এখনো এসব সামাজিক মিডিয়ায় মুখোশের আড়ালে প্রতিনিয়ত অারও কিছু সাহেদদের উপস্থিতি দেখছি। এসকল সাহেদদের মুখোশের আড়ালের মুখ চিনিয়ে দেবার দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য মিডিয়ার। মিডিয়া কর্মীরা কি এটা করতে পারছেন? এখানের অদক্ষ ও ইয়োলো জার্নালিজম রোগে আক্রান্ত সংবাদপত্র মালিক ও সংবাদ কর্মীদের দায়িত্বটা হলো অনেকটা এই ধরণের যে, ম্যাজিষ্ট্রট সরোওয়ার আলম কোন এক অপরাধীকে ধরলেন তারপর উনারা সব উঠে-পড়ে লেগে সাংবাদিকতার মহৎ পেশা জাহির করতে থাকলেন।

এই যে টিভিতে টকশো গুলো হয়, জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে পত্রিকাগুলোর গোলটেবিল বৈঠক ও সেমিনার হয়। এদের আলাপ অলোচনা ও উপস্থাপক সাংবাদিকের তথ্য উপাত্তের ধরণ দেখে ঐ সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁর অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতার প্রকাশ পায়। এরা যাদেরকে ঐসব অায়োজনে অংশগ্রহণ করান তা' শ্রেণি বিভক্ত সমাজের সাংবাদিক নিরপেক্ষতা হারিয়ে দালালীর চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। একে তো ব্যবস্থাপন পদ্ধতির উপর জ্ঞানের দৈন্যতা, জনগণের পক্ষের শ্রেণির কথা বলার উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বশীল অালোচকের অভাবে এসব সাহেদ শ্রেণির লোকেদের আলোচনায় সংকট বা উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানের দিকনির্দেশনা কি কি হতে পারে - সেটিও আড়ালে চলে যায়। এরই সুযোগ নেয় চিকিৎসা বাণিজ্যের অমানুষ বণিকের দল।

স্বাধীনতা সেনিটারিয়ান পরিষদ - স্বাসেপ নামের একটি পেশাজীবি সংগঠন এদেশে আছে। যার সদস্যরা হলেন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার রোগপ্রতিরোধী ধারার মেডিক্যাল শিক্ষায় শিক্ষিত। এই পেশাজীবি শ্রেণির জন্ম বৃটিশ কলোনিয়াল যুগে। প্রায় ১৫০ বছরের রোগপ্রতিরোধ কর্মের সমৃদ্ধ ইতিহাসের বাংলাদেশী প্রতিনিধিত্বের নাম স্বাসেপ। এই বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ প্রতিরোধী কর্মপদ্ধতি গ্রহণে স্বাসেপ যে প্রস্তাবনা দিয়ছিল সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে - ইহার বিকল্প কোন প্রস্তাব এখনো আমার নজরে আসেনি। কিন্তু এত সুন্দর, সময় ও অর্থ সাশ্রয়ী প্রস্তাবনা নিয়ে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় কোন আলোচনা হয়নি। স্বাসেপ নেতাদের কাছ থেকে রোগপ্রতিরোধী কার্যক্রম বিষয়ে জেনে নিতে কোন মিডিয়ায় ডাকও অাসেনি। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা চিকিৎসা বুঝেন, চিকিৎসা বাণিজ্যও বুঝেন, শুধু রোগপ্রতিরোধী কর্মপদ্ধতি বুঝেন না। এরই সুযোগে জন্ম নেয় সাহেদ, জন্ম নিচ্ছে সাহেদরা। অথচ, চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, "রোগের চিকিৎসার চেয়ে, রোগের প্রতিরোধই উত্তম ব্যবস্থা।"

লেখকঃ খছরু চৌধুরী,

জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট ও স্বাসেপ এর উপদেষ্টা। This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.