প্রতিরাতে তোমার ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে, সংসারের সমস্থ কাজ শেষ করে যেই ঘুমুতে যাই তখন চোখের পাতা জুড়ে ঘুমের জায়গায় তুমি চলে অাসো ৷ অামি নির্ঘুম কাটিয়ে দিই রাত ৷

ছেলেটা ইদানিং কত অাবদার করতে শিখেছে, কত সুন্দর করে বাবা ডাকতে শিখেছে, মা বলতে শিখেছে, তাছাড়া অারও কত দুষ্টুমি, যদি তুমি তা দেখতে?

অামি না অনেক দিন থেকে কোন বিয়ে-শাদী বা অন্য কোন সামাজিক অনুষ্টানে যাওয়া বাদ দিয়ে দিয়েছি ৷ যখনই কোন স্বামী-স্রীকে একসাথে দেখি, দেখি তাদের অাদরের সন্তান দুজনের মাঝখানে, অামার তখন খুব কষ্ট হয় ৷ এ কেমন কষ্ট অামি তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না ৷ অাচ্ছা- বলতো, মানুষ বাঁচে কয়দিন? জীবন থেকে কত কিছু হারিয়ে ফেলছি অামরা, তার কী কোন হিসেব রাখছ তুমি? তোমার দীর্ঘ প্রবাস শেষে তুমি হয়তো অনেক কিছু পাবে? তবে, অামি যদি অামার একটি নির্ঘুম রাত তোমার হাতে তুলে দিই, তুমি পারবে তা ফিরিয়ে দিতে? তুমি কী জানো, তোমার সন্তান কিভাবে হাসে, কিভাবে কাঁদে? কী চায় সে? অামার চাওয়াটাই বা কী? হয়তো ভাবছো, চাওয়া পাওয়ার হিসেব মিলাচ্ছি ৷ না, অাসলে তা নয় ৷
 
অামার একাকীত্ব ও শূণ্যতা থেকেই কথাগুলো তোমাকে বলছি ৷ প্লিজ, ভেবে দেখো তুমি এখন কী করবে? মোবাইল সাইলেন্ট করে স্রী-সন্তানের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে 'শুভ' ঘুমিয়ে পড়েছিল তার খেয়াল নেই ৷ সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই স্রীর পাঠানো ম্যাসেজটি পেয়ে সে বালিশে মুখ গুজে ঢুকরে কেঁদে উঠে ৷ মাঝে মাঝে সাগর যেমন উত্তাল হয়ে উঠে, সমুদ্রের বুক ছিঁড়ে ছুটে চলা নাবিক বিশাল জলরাশির বুকে যেমন দিশেহারা হয়ে পড়ে, শুভ'র অবস্থাও যেন অাজ ঠিক তেমনি ৷ তার বুকে জমানো কষ্টগুলো সাগরের ঢেউয়ের মত অাছড়ে পড়তে চাইছে ৷ এই নিঃসঙ্গ প্রবাসের কষ্টগুলোর কথা চীৎকার করে সবাইকে জানাতে চায় সে ৷ একটা কলম অার ডায়রিটা নিয়ে শুভ লিখতে বসে ৷ তুমি তোমার কষ্টের কথা, অামাদের সন্তানের কথা বলেছ ৷
 
এবার অামি অামার কিছু কথা বলি শোন- অাজ প্রায় তিন বছর হল অামি প্রবাসে ৷ অামার প্রতিটি দিন কিভাবে শুরু হয় জানো? কখনও খালি পেটে সিভি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্টানে দৌড়াতে থাকি ৷ অাবার কখনও এক কাপ চা খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি কাজের সন্ধানে ৷ চলতে পথে অামিও অনেক স্রী-সন্তান দেখি, কষ্টে অামার কলিজাটা ফেটে কান্না অাসে ৷ অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে যখন সারাদিন শেষে বাসায় পৌঁছি তখন দেখি ঘরে খাবার নেই ৷ অামাকে নিজে রান্না করে খেতে হয় অার না হয় না খেয়েই পড়ে থাকি ৷
 
তখন তোমাকে অারও বেশী মনে পড়ে ৷ তুমি কত যত্নে পাশে বসে খাবারগুলো পাতে তুলে দিতে ৷ অামি না করলেও জোর করে খাওয়াতে ৷ অার এখানে অামি খেয়ে না খেয়ে পার করছি সময় ৷ না পারছি এদেশে বৈধ হতে, না পারছি তোমাদের পাশে থাকতে, না পারছি উপার্জন করতে ৷ মাসের শেষে ঘরের ভাড়া ও খাবার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় অামাকে ৷ রাত যখন ঘনিয়ে অাসে ক্লান্ত দেহ মন বিছানায় এলিয়ে দিতেই তোমার কথা ভাবি, সন্তানের কথা ভাবি, বাবা-মা সবার ছবি ভেসে উঠে চোখের পাতায় ৷
 
ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি বুঝতেই পারিনি ৷ তবে প্রতি সকালে ঘুম ভাঙ্গলে পরে স্যাঁত স্যাঁতে বালিশের শীতল স্পর্শে বুঝতে পারি অনেক চোখের জল গড়িয়ে পড়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ৷ তোমাদের ছেড়ে এ গন্তব্যহীন প্রবাসে অামার প্রতিটি মূহুর্ত কতটা বিষাদের তা এক জীবনে বলে শেষ করতে পারবনা ৷ এতটুকু লিখার পর চোখ ঝাপসা হয়ে অাসে শুভ'র ৷ অার কলম চালাতে পারছেনা সে ৷ শরীর ও মনের সমস্ত শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে ৷ মাথাটাও ধরেছে খুব ৷
 
অনেক কিছু ভেবে নিজের লিখা কষ্টের কথা টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলে সে ৷ ভাবছে, অামার কষ্টগুলো অামারই থাক ৷ অামার স্রী-সন্তানকে অামার কষ্টকথা শোনালে ওরা অারও ভেঙ্গে পড়বে ৷ অামি বেঁচে থাকতে অামার স্রী-সন্তানকে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখতে চাইনা ৷ সে শুধু এটুকুই লিখে-- "পাগলি অামার, তুমি কী ভাবো অামি তোমাদের কথা ভুলে গেছি? এইতো অার ক'টা দিন ৷ অামি বৈধতা পাব, দেশে যাব, তোমরা এখানে অাসবে, অামাদের ছেলে এদেশের ভাল প্রতিষ্টানে পড়বে ৷ তখন দেখবে তোমার পিছনের কোন কষ্টের কথাই মনে থাকবেনা ৷ চিন্তা করোনা ৷ সব ঠিক হয়ে যাবে ৷
 
অামার ছেলেটির দিকে ও নিজের দিকে খেয়াল রেখো ৷ এবার লক্ষি মেয়ের মতো একটু হাসতো ৷ কতদিন তোমার সেই হাসিটা দেখিনা? নিজের প্রিয়তমা স্রীকে হাসির কথা বলে, বুকের জমানো কষ্টগুলো বুকের মাঝে স্ব-যত্মে তুলে রেখেই নিঃসঙ্গতাকে অালিঙ্গন করে ঘুমিয়ে পড়ে শুভ ৷
 
 
এখলাছ মিয়া, স্পেন।