তামান্না ইসলাম, ক্যালিফোর্নিয়া (যুক্তরাষ্ট্র) : আমার ছেলেকে এক বছর বয়সে প্রথম যে ডে কেয়ারে দিয়েছিলাম সেখানকার ভাষা ছিল ফ্রেঞ্চ। তার প্রথম শিক্ষক আধো আধো দুই একটা ইংরেজি শব্দ বলত। নাম জিজ্ঞেস করায় বলল, তাঁর নাম ‘কাহিল’।

আমি তাঁর বিশাল শরীর দেখে ছেলের বাবাকে বললাম, এ যদি হয় কাহিল, আমি তাহলে নাই। পরে বোঝা গেল, তাঁর নাম ‘কারিন’। ফ্রেঞ্চে ‘র’ কে ‘র’ ও ‘হ’-এর মাঝামাঝি একটা উচ্চারণ করে।
সেই ডে কেয়ারে গিয়ে আমার ছেলে টুকটাক ফ্রেঞ্চ হয়তো শিখেছে, কিন্তু আমরা তা বুঝিনি। তবে বাসায় সে বাংলা বলা শুরু করল। আমি বাচ্চাদের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর বকবক করি। মনে হয় এটা ছিল তার সুফল।

আমার ছেলের প্রথম স্কুলও ফ্রেঞ্চ। হোমওয়ার্ক, স্কুলের চিঠি সবই আসে ফরাসি ভাষায়। আমি গুগল সার্চ করে অনেক কষ্টে তার মর্মার্থ উদ্ধার করি। ছেলে বেশ হড়বড় করে ফ্রেঞ্চ বলে। আবার মিষ্টি করে বাংলাও বলে, কোনোরকম বিদেশি টান ছাড়াই। বাংলায় ছড়া বলে, দাদুর কাছে বাংলায় রূপকথার গল্প শোনে। এক রাতে ২৫টা গল্প শোনার রেকর্ডও আছে তার।

ওর যখন প্রায় ছয় বছর বয়স তখন আমার মেয়ের জন্ম। তার কিছুদিনের মাথায় আমরা সপরিবারে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসি। ছেলেকে নিয়ে আমি দারুণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। কোনোরকম ইংরেজি শিক্ষা নেই বলে। স্কুলে টেক্সাসের বাচ্চারা ওর ইংরেজি শুনে হাসাহাসি করে। আমার ছেলেটা প্রতিদিন মুখ অন্ধকার করে বাসায় আসে। এভাবে কয়েক মাস চলার পরে আমরা টেক্সাস ছেড়ে চলে এলাম ক্যালিফোর্নিয়ায়। ততদিনে সে ইংরেজি রপ্ত করে ফেলেছে। এতে স্কুলের দুশ্চিন্তা ঘুচলো। তার বোনের মুখেও বুলি ফুটেছে। প্রথম বুলি বাংলাতেই।

এদের দুই ভাইবোনের উচ্চারণ শুনে সাধারণত কেউ বুঝতে পারবে না যে এরা বাইরে বড় হয়েছে। কিন্তু খুব খেয়াল করলে বোঝা যায়, কোথায় যেন একটা অসংগতি আছে। আমাদের মাথা যেমন বাংলায় কিছু ভেবে নেয়। তারপর নিজের অজান্তেই সেটা ইংরেজি ট্রানসেলেশন হয়ে মুখ দিয়ে ইংরেজি বের হয়। কিন্তু এদের প্রসেসিং পুরা উল্টো। প্রথম প্রথম ‘ব’, ‘ভ’ বা ‘দধ’ পাশাপাশি তাড়াতাড়ি বলতে হলে উল্টাপাল্টা করে ফেলত। যেসব বর্ণের মিল মতো ইংরেজি উচ্চারণ নেই, সেগুলো নিয়েই সমস্যা হতো। বড় হতে হতে সেগুলো ঠিক হয়ে আসে। তার পরেও হঠাৎ করে বলে বসে ‘সোম বার কি?’

ছোটবেলায় আরেক সমস্যা ছিল। ধর্ম, জাতীয়তা ও দেশ-এগুলো বোঝানো। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তারা বাঙালি, বাংলাদেশি ও মুসলিম এই তিনটাকেই সমার্থ ভাবতো। যতই বোঝাই না কেন, তার পরেও ফট করে বলে বসত, ‘ও বাঙালি কীভাবে, ও তো মুসলিম না? ’ মেয়ের নাচের শিক্ষিকা পশ্চিমবঙ্গের। তার মানে সে ভারতীয়, বাংলাদেশি না। এদিকে সে বাংলায় কথা বলে। মেয়ে তো বড়ই তাজ্জব। আমার ধারণা এক সঙ্গে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি সব গুলে খাওয়াতে গিয়ে এই সমস্যার সৃষ্টি। অবশ্য বড় হওয়ার পর সেই সমস্যা দূর হয়েছে।
তবে বড় হয়ে যে সমস্যা শুরু হলো, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি দেখলাম, দুই ভাইবোন যখনই নিজেদের মধ্যে কথা বলে তখনই কখন যেন শুরু হয় ইংরেজি। ইংরেজিতে ঝগড়া করেও এরা আরাম পায়। আমি প্রথম প্রথম প্রচণ্ড বাধা দিয়েছি। ওদেরকে বলতাম ‘বাসায় ইংরেজি শুনলে আমার মাথা ধরে।’ সঙ্গে সঙ্গে বাংলা বলা শুরু করে। পরক্ষণই আবার ভুলে গিয়ে হয়তো ইংরেজি শুরু করল। আমার সঙ্গে কখনো বলে না। আমি বেশি রাগ করলেও আমার সামনে বলে না, চোখের আড়াল হলেই বলে।

প্রবাসে বিভিন্ন শহরে বাঙালিদের উদ্যোগে বাংলা স্কুল আছে। আমাদের শহরেও কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে। আমি সেখানে আমার বাচ্চাদের নিইনি। প্রধানত দুটি কারণে, প্রথমটা সময়ের অভাব। এখানে বাচ্চারা পড়ালেখার বাইরে অসংখ্য কাজে ব্যস্ত থাকে। ওদের মা-বাবার সঙ্গে বিশ্রাম ও পারিবারিক সময় কাটানোর কোনো সময় নেই। সবকিছুর প্রায়োরিটি হিসাবনিকাশ করতে গিয়ে আমার মনে হলো, সম্ভব হবে না। দ্বিতীয় কারণটা আরেকটু গভীর, আমার কাছে মনে হতো ভাষা লিখতে পড়তে পারার চেয়েও বেশি জরুরি শুদ্ধ করে বলতে পারা। আমি স্বার্থপরের মতো ভাবতাম, আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমি যদি প্রাণখুলে কথা বলতে পারি তাহলেই আমি খুশি।

তার মানে হলো, আমার সংস্কৃতিকে ওদের ভালো করে জানতে হবে এবং মূল্যবোধকেও। আর কোনো টান ছাড়া বাংলা বলতে হবে। যেটা সপ্তাহে একদিন বাংলা স্কুলে গিয়ে হবে না। ওদেরকে বাংলা গান-নাচ শেখানো হয়েছে, টিভি দেখানো হয়েছে। ঘন ঘন দেশে যাই, দাদা-দাদি, নানা-নানি আসে। ছেলেকে একবার একাই সামারে দেশে পাঠানো হলো। এখানে পয়লা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, ঈদ সবই পালন হয়। সব বাবা-মা-ই নিজেদের মতো আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
বাংলা স্কুলের বাচ্চাগুলো বা আমার ছেলেমেয়েরাও সেই সব অনুষ্ঠানে গিয়ে শেখানো কবিতা, নাচ, গান করে আসছে। কেউ কেউ লিখে নিয়ে আসছে। নিজের লেখা পড়ছে। তাদের উচ্চারণের কথা যদি বাদও দিই, তার পরেও জানি, এই অনুষ্ঠানের পর একটা বাচ্চারও মনে হবে না শখ করে একটা বাংলা বই পড়ি। ব্যতিক্রম হয়তো আছে, কিন্তু এটা সাধারণ চিত্র।

আমি অনেক ভেবে দেখেছি, এটা ওদের দোষ না বরং এটা ওদের জন্য অনেক কঠিন একটা কাজ। সংস্কৃতি, ভাষা-এগুলো মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ। একটা সংস্কৃতির মধ্যে বড় না হয়ে সেই সংস্কৃতিকে ধারণ করা, ভালোবাসা সম্ভব না। যে কারণে আমার বহুদিন ইংরেজি বই পড়তে ভালো লাগত না, ফিকশন ছাড়া কিছু পড়তাম না। ঠিক একই কারণে প্রবাসে বড় হওয়া আমাদের এই বাচ্চাদের বাংলা বইয়ের বা নাটকের রস আস্বাদন করা খুব কঠিন। দিনের বেশিরভাগ সময় এরা অন্য ভাষা, অন্য সংস্কৃতির মাঝে কাটায়। এই টানাপোড়েন পড়ে শেষ পর্যন্ত কি হয় বলা মুশকিল। তবে সুখবর এই যে, আমাদের আগের জেনারেশন যাঁরা বাইরে এসেছেন, তাঁরা যেমন তাঁদের বাচ্চাদের বাংলা ভাষা বা সংস্কৃতি শেখানোর সুযোগ একদমই পায়নি, এখন পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক ভালো। অন্তত ৯০ ভাগ দ্বিতীয় প্রজন্ম বাংলা মোটামুটি বোঝে, ইংরেজিতে উত্তর দিলেও তারা বাংলা কথা বোঝে। অনেকেই পুরোপুরি বলতে পারে। কেউ কেউ লিখতে, পড়তে পারে। কিশোরী, তরুণীরা শখ করে শাড়ি পরে। এই বা কম কি?