আবারও বাঙালি’র ইতিহাস সৃষ্টি । বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মর্যাদাপূর্ণ ইউনিভার্সিটি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস এন্ড পলিটিক্যাল সাইন্স (এলএসই) ছাত্র সংসদের সর্বোচ্চ পজিশন সাধারণ সম্পাদক পদে এবার নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত তরুণ মাহাথির পাশা।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত তুমুল প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত আলেক্স বার্জেসকে হারিয়ে বিশ্ব ছাত্র রাজনীতির অন্যতম আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ এই পদে নির্বাচিত হন মাহাথির। মোট ৬জন প্রার্থির মধ্যে সর্বশেষ রাউন্ডে ঠিকে থাকা মাহাথির ও আলেক্সের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় মূল প্রতিদ্বন্ধিতা। শেষ পর্যন্ত ১ম, ২য় ও ৩য়, তিন রাউন্ডেই মাহাথির পরাজিত করেন আলেক্স বার্জেসকে। মোট প্রদত্ত ২ হাজার ৩শ ৬৭ ভোটের মধ্যে মাহাথির পান ৯৬০ ভোট এবং আলেক্স বার্জেস পান ৯৫৪ ভোট। ভোটের ব্যবধান মাত্র ৬টি। এদিকে, রিটার্নিং অফিসার বিজয়ী হিসেবে যখন মাহাথিরের নাম ঘোষণা করেন, তখন উল্লাসে ফেটে পড়ে ভোট কাউন্টিং হলে সমবেত এলএসই ছাত্রছাত্রীরা। পাশা, পাশা ধ্বনীতে মূখরিত হয়ে ওঠে পুরো হল। সমর্থকরা এসময় ভোট কাউন্টিং হলে উপস্থিত মাহাথিরের মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরেও আনন্দ উল্লাস করতে থাকে।

ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ী ভাষণে মাহাথির এলএসই ছাত্রছাত্রীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, একতাবদ্ধ ছাত্রশক্তি অনেক কিছুই অর্জন করতে পারে, আজকের নির্বাচন তার আরেকটি প্রমান। এলএসই ক্যাম্পাসের ক্লিনারদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের চলমান ক্যাম্পেইন ‘জাষ্টিস ফর ক্লিনার্স’ এর প্রতি সমর্থন দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইরানের প্রেস সেন্সরশীপ, সাউথ আফ্রিকার জাতীগত বিদ্বেষ বা এলএসই ক্যাম্পাসের ‘জাষ্টিস ফর ক্লিনার্স’, ঐক্যবদ্ধ ছাত্রশক্তির কাছে কোন আন্দোলনেই বিজয় ছিনিয়ে আনা অসম্ভব নয়। সুতরাং ছাত্রশক্তিকে ছোট করে দেখতে নেই’।

নির্বাচনী জয়-পরাজয় ভুলে ষ্টুডেন্টদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে মাহাথির বলেন, ‘নির্বাচনের সময় স্বাভাবিক ভাবেই একটি বিভক্তি আসে। ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থিকে সাপোর্ট দিতে গিয়ে সাময়িক সময়ের জন্যে হলেও একটি দুরত্ব সৃষ্টি হয়। নির্বাচন শেষ, এই মুহূর্তেই সব দুরত্ব আমাদের মুছে ফেলতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে সাময়িক এই বিভক্তি, এই দুরত্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মর্যাদাপূর্ণ ইউনিভার্সিটি এলএসই স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সর্বোচ্চ পদ জেনারেল সেক্রেটারী। ফুলটাইম এই পদের বেতন বছরে ২৮ হাজার ৮শ পাউন্ড।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে (LSE) শিক্ষাজীবন শুরুর প্রথম দিকেই মাহাথির এলএসই কোর্ট অব গভর্ণরের ষ্টুডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ নির্বাচিত হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে পরবর্তীতে সে বিভিন্ন সময় নির্বাচিত হয় এলএসই’র ষ্টুডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ অন কাউন্সিল (বোর্ড অব ডাইরেক্টরস মেম্বার), ব্লাক এন্ড এথনিক মাইনোরিটি (BME) অফিসার ও UGM চেয়ার (স্পীকার)। একটার্ম LSESU এর সাপ্তাহিক নিউজ পেপার ‘বিভার’ এর নিউজ এডিটরেরও দায়িত্ব পালন করে সে।

মাহাথির বিশিষ্ট সাংবাদিক, সত্যবাণীর প্রধান সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশা এবং টাওয়ার হ্যামলেটস চিলড্রেন সার্ভিসের কমিউনিটি ডেভোলাপমেন্ট অফিসার সৈয়দা ফেরদৌসি পাশা কলি‘র বড় সন্তান। তাঁর দাদা ও নানা ছিলেন যথাক্রমে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সুনামগঞ্জের এক সময়ের বাম প্রগতিশীল রাজনীতিক মরহুম সৈয়দ আহবাব আলী ও ব্রিটেনে মুক্তিযুদ্ধের আরেক সংগঠক মরহুম সৈয়দ শামসুল হক। সুনামগঞ্জ জেলার, জগন্নাথপুর থানার সৈয়দপুর গ্রামে মাহাথিরের পূর্ব প্রজন্মের আদিবাস। সেই ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার উৎসাহে মাহাথির বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রতি ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্যনীয় ছিলো। গত বছর ৭ই মার্চ তাঁর উদ্যোগে এলএসই তে অনুষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গবন্ধু নাইট’। ঐ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এলএসইতে অধ্যায়নরত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীরা জানতে পারে বাঙালির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে। সাংবাদিকতার প্রতি ব্যাপক আগ্রহী মাহাথির তার ইউনিভার্সিটি ভেকেশনে সিএনএন, ইন্ডিপেন্ডেনটসহ বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। ঐ সংবাদ মাধ্যমগুলোতে তাঁর লেখা বিভিন্ন রিপোর্ট ব্যাপক প্রশংসা পায় পাঠকের।

সম্প্রতি ব্রিটেনে বাংলা মিডিয়ার শতবর্ষ উদযাপন ও ১৯১৬ সালে ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত প্রথম বাংলা পত্রিকা সত্যবাণী’র অনলাইন শুরু মূলত তারই পরিকল্পনার ফসল।